Skip to main content

জীবনের আশা




নাইম ফোন হাতে রেখেই চুপ করে বসে পরলো। বসে নিজের কাছে নিজের কথা বলতে থাকলো। এই কি সেই ঝুমুর!! যার জন্য নাইম এতকিছু করলো। আর সেই ঝুমুর আজ এমন হয়ে গেল?
তিন বছরের বেশি সময় ঝুমুরের সাথে নাইমের প্রেমের সম্পর্ক। প্রথমদিকে ভাল গেলেও আজ নাই নাই অবস্থায় পরে রয়েছে। আজ সেই প্রথম দিনগুলোর কথা মনে পরে যাচ্ছে।


তিন বছর আগে, নাইম কোচিং সেন্টারে এসে বসে আছে। আজ মনেহয় আগেই চলে এসেছে। তাই, নিজে নিজে অসস্তিতে ভুগছে। তাই বসে থাকতে ভাল লাগছে না।


নাইম বাইরে এসে অনেককেই আসতে যেতে দেখছে। কাউকে চেনা আবার কাউকে অচেনা। হঠাৎ নাইম একটা মেয়েকে তার দিকেই আসতে দেখলো।


মেয়েটি কাছাকাছি আসতে মনেহল সে কোচিং সেন্টারেই ঢুকছে। তাই নাইম দাঁড়িয়ে না থেকে নিজেও কোচিং সেন্টারে ঢুকে গেল। আর মেয়েটিকে লক্ষ করতে থাকলো।


নাইম দেখলো মেয়েটি তাদের ক্লাসে এসেই বসলো। তাই নাইম বাইরে না দাঁড়িয়ে রুমে এসে বসে থাকলো। আর মাঝেমাঝে মেয়েটিকে দেখতে থাকলো।


কিছুক্ষণ পরে ক্লাস শুরু হয়ে গেল। নাইম ক্লাসে মন দিল। মাঝেমাঝে মেয়েটির দিকে তাকাতেই দেখতে পায় মেয়েটি মুচকি মুচকি হাসছে। আর হাসিটাও প্রানবন্ত হাসি।


সেদিনের মত এভাবেই ক্লাস শেষ হয়ে গেল। কোচিং শেষে নাইম ওদিকে না এগিয়ে বাড়ি চলে আসলো।


এরপরে নাইম ক্লাসে প্রায়ই মেয়েটিকে দেখে। মেয়েটির সাথে কথা বলতে গিয়েও বলা হয় না। ইচ্ছা থাকলেও হয়ে ওঠে না। তাই তাকিয়ে দেখেই যায়।


আজ নাইম তার গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে এসেছে। কিন্তু ঘুরতে এসে একটা অবাক ব্যাপার মনে হল। গ্রামে মনে হয় সেই মেয়েটিকে দেখলো। কিন্তু দেখতে দেখতেই হারিয়ে গেল।


নাইম তার দাদার বাড়িতে বসে কিছু একটা করছিল। এমন সময় মেয়েটিকে আবার দেখলো। তবে এবার কাছাকাছি সামনে থেকেই।


নাইম প্রথমে কথা বলল
-তুমি এখানে?
-হ্যা।
-তোমার বাড়ি এখানে?
-না। আমার নানুর বাড়ি।
-তোমার নানুবাড়ি কোনটা?
-ওইটা।
-আরেহ ওটা তো আমার চাচাত দাদার বাড়ি। তাহলে তুমি আমার ফুপাত বোন?
-হ্যা। আমি জানি।
-তাহলে আগে পরিচয় দাও নি কেন?
-আমার দরকার পরে নি। তুমি নাইম এটা আমি জানতাম।
-তুমি তাহলে সেই ঝুমুর?
-হ্যা।
-আচ্ছা আমি আসছি।


নাইম কয়েকদিন গ্রামে কাটানোর পরে আজ আবার ফিরে আসছে। এই কয়েকদিনে ঝুমুরের সাথে খুব ভাল সম্পর্ক হয়ে গিয়েছে। নাইম ঝুমুরের কাছাকাছিও চলে এসেছে।


বাড়িতে এসে নাইমের মনে হচ্ছে ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে থাকা, তার হাসির প্রতি দুর্বল হওয়া এই কথাগুলো বললেই হত। আর মনে কিছু আছে সেটা বললেও হত। কিন্তু কথা বলতেও বলা হয় নি।


নাইম পরেরদিন কোচিং এ এসে ঝুমুরের সাথে দেখা। ঝুমুরকে ডাক দিয়ে বলল
-এই ঝুমুর শোনো।
-বলো।
-তুমি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে মুচকি হাসো কেন?
-আমার হাসতে ইচ্ছা করে।
-তোমার হাসি কারো বুক তোলপাড় করতে পারে সেটা তুমি জানো?
-আমি তো আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে যাই নি।
-আমাকে জিজ্ঞেস করলেই পারতে।
-আমার প্রয়োজন নেই।
-আমার প্রয়োজন আছে।
-কি কারনে?
-তোমার ওই হাসি আমার বুকে আলোড়ন তৈরি করেছে। আর তুমি যদি একে ভালবাসা ভেবে নাও তাহলে সেটা ভালবাসা। আর যদি ভাবনাহীনভাবে দুরে দাও তবে সেটা ভাললাগা হয়েই থাকে।
-কি বলতে চাচ্ছ তুমি?
-তুমি কি বুঝতে পারছ না আমি তোমার প্রেমে পরেছি। আর আমি এটাকে ভালবাসা রুপে দেখতে চাই। আমি তোমাকে ভালবাসি।
-আমি বাসি কি না সেটা জানো?
-জানতে চাই। আর এর জন্য আমি তোমাকে সময় দিচ্ছি। এই নাও আমার নাম্বার। যদি ভালবাসো তবে ফোনে দেবে। আর তার আগে আমি তোমার সামনে আসবো না।


নাইম সেদিন আর কিছু না বলেই চলে আসে কিন্তু এই দুইদিনে ঝুমুরের কোন সাড়া পায় নি। তাই কোচিং এ ও যায় নি। তবে আশা বাঁচিয়ে রেখেছে।


নাইম সকাল বেলা অচেনা নাম্বার এর ফোন ধরলো
-হ্যালো।
-তুমি আজকেই কোচিং এ আসবে।
-কে আপনি?
-যাকে ভালবাস তার কন্ঠ চিনতে পারো না?
-ঝুমুর!!
-হ্যা। আজকেই কোচিং এ আসবে।
-কেন?
-তাছাড়া আমার সাথে প্রেম করবে কিভাবে?
-মানে?
-অত বুঝতে হবে না। তুমি এখনই কোচিং এ আসো।
-আচ্ছা।


নাইম কোচিং সেন্টারে গিয়ে ঝুমুরের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। ঝুমুর বলল
-চলো আমার সাথে।
-কোথায়?
-প্রেম করতে যাবো।
-হাতটা ধরো।
-ধরলাম।
-সারাজীবন ধরে রেখ।


তারপরে শুরু নাইম আর ঝুমুরের প্রেম। তবে সেটা চুপিচুপি ভাবেই। চুপিচুপি প্রেম হলেও তাদের ভালবাসার কমতি নেই। আর চুপিচুপি প্রেমই মজা।


কিন্তু কপালে বেশিদিন সুখ সহ্য হয় না। তাই তাদেরও সহ্য হল না। তাদের প্রেম জানাজানি হয়ে গেল। প্রথম দিকে বন্ধুরা জানলেও পরে দুই পরিবার থেকে জেনে গেল।


জানাজানির পরেই তাদের প্রেমে সমস্যার শুরু। কিন্তু তারা সুযোগ পেলেই আরো কাছাকাছি চলে আসতো। কিন্তু এটা জানাজানির পরে প্রকৃতি তাদের দুইজনকে দুইদিকে দিয়ে দিল।


নাইমকে কোচিং বাদ দিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। আর ঝুমুর নানাবাড়ি থেকে দাদাবাড়ি চলে গেল। ঝুমুর চাপে পরেও নাইমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করত। কিন্তু পারতো না।


কারন ততদিনে নাইমকে মোবাইল ব্যাবহার করা বন্ধ করে দিয়েছে। তবুও নাইম চেষ্টা করে যেত ঝুমুরের যোগাযোগ করার জন্য।


এভাবে চলতে চলতে দুইজনের এস এস সি পরিক্ষা শুরু হয়ে গেল। আর ভাগ্যক্রমে দুইজনের সিট পড়লো একই হলে।


নাইম আর ঝুমুরের পরিক্ষার সিট ছিল আলাদা রুমে। কিন্তু ঝুমুরের পাশেই নাইমের কাছের এক বান্ধবির সিট পরলো। আর নাইম তার মাধ্যমেই ঝুমুরের সাথে যোগাযোগ করল।


এভাবে চলতে চলতে পরিক্ষা শেষ হয়ে গেল। আর তাদের যোগাযোগ কিছুটা আগের চেয়ে ভালভাবে চলতে থাকলো।


নাইম হতাশ হল পরিক্ষার রেজাল্ট শুনে। তার পরিক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল হল না। কিন্তু ঝুমুরের রেজাল্ট শুনে নাইম খুশি হল। কারন ঝুমুরের রেজাল্ট খুব ভাল ছিল।


তারপরে দুইজন দুই কলেজে ভর্তি হল। অন্য কলেজে ভর্তি হওয়ার নাইম ঝুমুরের কলেজে গিয়ে দেখা করতো। কিন্তু ঝুমুর এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো।


নাইম আরও হতাশ হল ঝুমুরের খুব কাছের বান্ধবির বিয়ের কথা শুনে। ঝুমুরের বান্ধবি একাধিক ছেলের সাথে প্রেম করতো। কিন্তু যখন সরকারি চাকরিজিবি ছেলের সাথে বিয়ের কথা হতেই ঝুমুরের বান্ধবি বিনা বাক্যের রাজ্যে রাজি হয়ে গেল।


নাইমের মনে আজ একটা ভিতি খুব ভালোভাবে মনে জুড়ে বসেছে। আর সেটা হল ঝুমুরকে হারিয়ে ফেলার ভয়। যদি ঝুমুর হারিয়ে যায় নাইমের জীবনের কিছুই মনেহয় থাকবে না।


কারন ঝুমুরের প্রেমের কারনে নাইম জীবনের অনেক কিছুই নষ্ট করেছে আর হারিয়ে ফেলেছে। ঝুমুরের জন্য বাবা মায়ের সন্মানের কথা ভাবে নি। সবার কাছে খারাপ হয়ে গেছে। হারিয়েছে জীবনের অনেক মুল্যবান সময়। আর অর্থের কথা নাহয় থাক।


এতকিছুর করার পরেও ঝুমুর যদি নাইমের জীবন থেকে হারিয়ে যায় তবে এতকিছুর মানে কি? এতকিছু কার জন্য করল? নাইমের জীবন থেকে ঝুমুর কখনও যেন হারিয়ে না যায়।


হারিয়ে গেলে নাইম বেচে থাকবে। কিন্তু সপ্নগুলো মরে যাবে। হারিয়ে যাবে তার জীবনের আশা । জীবন হবে বিষময়। আর এটা যেন কখনও না হয়, এটাই চাওয়া।
.

Comments

Popular posts from this blog

গল্প: ফিরে আসা, লিখা-আয়েশা

আমার বরকে দেখলাম একটা মেয়ের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছে।আমাকে দেখেই মোবাইল টা ঘুরিয়ে রাখল।আমি কিছু বুঝতে দিলাম না।রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল পানি খাবো দেখলাম রায়হান সেই ভিডিও কল নিয়ে ব্যস্ত।আমি পানি খেয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমন্ত ছোট্ট সোনামণি নওমির দিকে চোখ পড়ল।কি মায়া আমার সন্তানের মুখটি।ওর জন্য আমি সব কষ্ট সহ্য করতে পারি।আমি রায়হান আর আমার দেড় বছরের মেয়ে নওমি আমরা একটা ভাড়া বাসায় থাকি।লাভ মেরিজ করে বিয়ে করেছি।প্রথমে মেনে না নিলেও এখন মেনে নিয়েছে দুই পরিবার। প্রায় পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর বিয়ে করি আমরা।রায়হান আমাকে খুব ভালোবাসতো।আর বলতো তুমি আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী।তখন মোহের কারনে বিশ্বাস করতাম আর অনেক খুশি হতাম  বিয়ের পরেও অনেক ভালোবাসা ছিল।কিন্তু নওমি পেটে আসার পর থেকে ও কেমন যেন হয়ে গেছে।এখন আর আমার দিকে তাকানোর ও সময় পায় না।ভালো করে কথাও বলে না।খুব ব্যস্ততা দেখায়।আগে আমাকে ছাড়া ভাত খেতে পারত না আর এখন বলেও না তুমি খেয়েছো কিনা। একদিন রাত বারোটার দিকে ঘুম ভেঙেছে, দেখলাম রায়হান পাশে নেই।পরে দেখলাম সোফায় শুয়ে শুয়ে ঐ মেয়ের সাথে কথা বলছে কানে হেডফোন লাগিয়ে।আমি আর সহ্যকরতে পারলাম না টান দিয়ে ফোনট...

নিঃশব্দ ভালবাসা -- শেখ শরিফ জয়

--- আমাকে একটু ভালবাসবি? --- কেন? --- মানুষ ভালবাসে কেন জানিস না? --- না। তুই বল! --- সাদা কালো জীবনটা রঙিন করার জন্য ভালবাসে। --- তাহলে থাক। আমার জীবন এমনিতেই রঙিন। --- কিন্তু আমার জীবনতো সাদা কালো রং চটা। --- তাতে আমি কি করবো? --- সেই জন্যইতো আমার একটু ভালবাসার রং দরকার। যে রং দিয়ে আমার জীবনটা রঙিন করতে পারি। --- না ,আমি পারবো না। --- আমি জানি তুই পারবি। প্লীজ একটু চেষ্টা করে দেখ। --- আচ্ছা তাহলে দেখি। .. কিছু সময় পর ,,, .. --- কিছু চেষ্টা করে দেখলি? --- দেখছি তবে হয় না রে। --- কি বলিস! হবেনা কেন! হবে। চোখ দুটো বন্ধ করে দেখ পারবি। --- কেনো! চোখ বন্ধ করে কি মানুষকে ভালবাসতে হয়? --- হুম চোখ বন্ধ করে ভালবাসতে হয়। --- তাহলে থাক। আমি অন্ধের মত ভালবাসতে পারবো না। --- তুই যেভাবে ভালোবাসতে চাস সেই ভাবেই ভালবাসিস। তবুও ভালবাস। --- আচ্ছা তোকে ভালবাসলে আমাকে কি দিবি? --- তোর জন্য এনে দেব একশত একটা লাল পদ্ম। মধ্য কপালে ঠাঁই পাবে নীল টিপ। নরম কোমল হাতে পরিয়ে দেব কাঁচের এত্ত গুলা চুড়ি। কালো ক্যাশে গুজে দেব রজনীগন্ধা। --- না থাক। --- কেন ! আবার কি হল? --- তোর এ...